দুর্গাপুরের রবীন্দ্র ভবনের মঞ্চে সেদিন সময় যেন একটু থমকে দাঁড়িয়েছিল। বয়স, দায়িত্ব, সংসার আর কর্মব্যস্ততার ভার নামিয়ে রেখে এক নারী আবার ফিরে গিয়েছিল তাদের শৈশব কৈশোরে। দীর্ঘ দুই দশক পর দুর্গাপুরে আকবর রোড গার্লস হাই স্কুলের ১৯৮৬ সালের প্রাক্তনীরা মিলিত হয়েছিলেন তাদের অষ্টম পুনর্মিলন উৎসবে – এক এমন মিলন মেলা যেখানে অতি তার বর্তমান হাত ধরাধরি করে চলেছিল। এই পুনর্মিলনে শুধু বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্রীরাই নন উপস্থিত ছিলেন তাদের প্রিয় শিক্ষিকাদেরও অনেকে। যাদের হাত ধরে একদিন গড়ে উঠেছিল তাদের জীবনের ভীত, সেই মানুষগুলোর সঙ্গে আবার দেখা হওয়া যেন অতীতের দিনগুলোকে চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিল। এদিন পুনর্মিলন উৎসব অনুষ্ঠানে কি জানালেন প্রাক্তন ছাত্রীরা শুনে নেওয়া যাক তাদেরই মুখ থেকে।

চেনা মুখ অথচ বদলে যাওয়ার সময় কারোর কপালে পাক ধরেছে কারোর চোখে জীবনের অভিজ্ঞতার চাপ তবু একবার নাম ধরে ডাকতেই ভেঙে পড়েছে সব দূরত্ব। আবার সেই স্কুলের ডাকনাম, সেই অট্টহাসি, সেই নির্ভেজাল উচ্ছ্বাস। এদিন এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রাক্তন শিক্ষিকা দাস কি জানালেন শুনে নেব।

অনুষ্ঠানের পড়তে পড়তে ছড়িয়ে ছিল স্মৃতির রোশনাই। কখনো নাচে কখনো গানে কখনো আবৃত্তিতে উঠে এলো স্কুল জীবনের টুকরো টুকরো মুহূর্ত কেউ গাইডেন প্রিয় রবীন্দ্র সঙ্গীত কেউ আবৃত্তি করলেন সেই কবিতা। যা একদিন বার্ষিক অনুষ্ঠানে গলা কাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আবার কেউ মঞ্চে দাঁড়িয়ে শোনালেন পুরোনো দিনের মজার গল্প। যেখানে আছে শাসন, আছে শাস্তি, আছে লুকিয়ে হাসার অপরাধ! মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে বসে যেন ফিরে এলো স্কুলের টিফিন ব্রেক প্লেটের খাবারের চেয়েও বেশি ভাগাভাগি হলো জীবনের গল্প কেউ কর্মসূত্রে ব্যস্ত কেউ সংসারের দায়িত্বে। কেউ দূরের শহরে বা রাজ্যে। তবু এত দূরত্বের মাঝেও বন্ধন ছিন্ন হয়নি।

আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়াই হয়ে উঠেছে তাদের যোগাযোগের সেতু – যার হাত ধরেই সম্ভব হয়েছে এই পুনর্মিলনের আয়োজন। এই উৎসব শুধু একদিনের অনুষ্ঠান নয় এটি ছিল বন্ধুত্বের পুনরুদ্ধার, স্মৃতির পুনর্জন্ম। বিদায়ের সময় কেউ বললেন, “এত বছর পর বুঝলাম, আমরা আসলে কোথাও আলাদা হইনি।” চোখের জল, শক্ত করে ধরা হাত, আর আবার দেখা করার প্রতিশ্রুতি – সবমিলিয়ে রবীন্দ্রভবনের সেই বিকেল হয়ে উঠল এক আবেগের দলিল। সময় এগিয়ে চলে জীবন বদলায়। কিন্তু কিছু সম্পর্ক থেকে যায় সময়ের ঊর্ধ্বে। আকবর রোড গার্লস হাই স্কুলের প্রাক্তনীদের এই মিলনমেলা প্রমাণ করে দিল – শৈশব কখনো ফুরায় না সে শুধু স্মৃতির ভিতরে অপেক্ষা করে আবার ফিরে আসার জন্ম।
সমরেন্দ্র দাস, Lcw India দুর্গাপুর

