দুর্গাপুরের বাতাসে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক আলাদা উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছিল। শীতের নরম রোদ আর পাতা ঝরার শব্দের সঙ্গে যেন শহরের ফুটবলপ্রেমী মানুষের হৃদয় বাড়ছিল একটাই সুর – ফুটবলের ফিরে আসা। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পনগরীর ক্রীড়া মাঠগুলি নতুন প্রজন্মের পায়ের শব্দের অপেক্ষায় ছিল। আর সেই প্রত্যাশাকে বাস্তব রূপ দিতে এগিয়ে এলো দুর্গাপুরের নব ওয়ারিয়ার দুর্গাপুর নবজাগরণ ক্লাব, সঙ্গে তাদের সহযোগী হিসেবে সুকন্যা ক্লাসেস। ২৭ শে নভেম্বর দিনটি তাই শুধু একটি ম্যাচের দিন ছিল না; ছিল একটি উদ্দেশ্যের দিন, ছিল নতুন দিগন্তের সূচনা। সেই দিনে অনুষ্ঠিত হলো দুর্গাপুর নবজাগরণ ফুটবল কাপ ২০২৫।

আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো নয়, এদিন দূর থেকে দেখলেও বোঝা যাচ্ছিল সবই যেন সাজানো হয়েছে এই উৎসবকে সামনে রেখে। ভিড় ছিল ছোট ছোট পড়ুয়া যুবক অবসরপ্রাপ্ত ফুটবলপ্রেমী এমনকি পরিবার নিয়ে আসা সবার চোখেই একই ধরনের প্রত্যাশা ঝিলিক। যারা ছোটবেলায় মেহতাব হোসেন, সৈয়দ রহিম নবী কিংবা ষষ্ঠী দুলে, শুভাশিস রায়চৌধুরী বা অর্ণব মন্ডলের খেলা দেখতে মাঠের ছুটে গেছেন, তাদের চোখে তখন আবার ফিরে আসছিল পুরোনো দিনের আবেগ। আর যারা প্রথমবার এদের দেখতে এসেছে তারা বুঝতে পারছিল প্রকৃত তারকা বলতে কী বোঝায়! অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবি দত্ত, বর্ধমান সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান উত্তম মুখার্জি, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বাউড়ি সমাজ কালচারাল কমিটির চেয়ারম্যান দীপক দুলে, সুকন্যা ক্লাসেস এর কর্ণধার সুকন্যা ব্যানার্জি সঙ্গে শহরের বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। মঞ্চে উপবিষ্ট সকল অতীতের উত্তরীয় ও পুষ্পস্তবক দিয়ে সম্বর্ধনা জানানো হয়।

তবে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় নয় মঞ্চ থেকে উঠে এলো এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। যা অনুষ্ঠানে পরিবেশ সচেতনতার স্বরও যোগ করল। এরপর মাঠে নামলেন কিংবদন্তিরা ইতিহাস যেন আবার জীবন্ত। ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান শিবিরের প্রাক্তন তারকা যাদের নাম এক সময় ছিল দেশের ফুটবলের উজ্জ্বল পরিচয় শুভাশিস রায় চৌধুরী মেহতাব হোসেন নবী থেকে শুরু করে টেনশন দেবদাস অর্ণব মন্ডল হাবিবুল রহমান অসীম বিশ্বাস একে একে তারা যখন মাঠে নামলেন দর্শকদের হাততালি আর উল্লাসে মাঠ ভরে গেল। আর সেই সব তারকাদের নামের পাশে দাঁড়ালো দুর্গাপুরের তরুণ ফুটবলের ভবিষ্যৎ – আকাশ ,অনুপ সালাউদ্দিন, অনিল, ঝন্টু, রাকেশ, সুমন্ত, মার্শাল, কিষান, শ্রীকান্ত, বাপি ও বিবেক যাদের চোখে ছিল স্বপ্ন উত্তেজনা এবং প্রজন্মের সেরা দের সঙ্গে মাঠে নামার অদম্য আত্মবিশ্বাস। মূল পর্বের দুই অর্ধের খেলা গোলশূন্য অবস্থায় শেষ হওয়ায় খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। অবশেষে ট্রাইবব্রেকারে অনবদ্য একটি সেভ দিয়ে দলকে এগিয়ে দেয় প্রাক্তন তারকা একাদশ এর গোলরক্ষক শুভাশিস রায়চৌধুরী। ৫ – ৪ গোলের ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন হয় ইস্ট – মোহন একাদশ। তারকা ফুটবলাররা জানালেন সত্যিই অভূতপূর্ব খেলেছে উদীয়মান ফুটবলাররা। ভালো লাগলো মোবাইল গেমে হারিয়ে যাওয়া কিশোররা আবার মাঠে ফিরেছে এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।

এই ম্যাচ শুধু খেলা নয়, বরং ফুটবল সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন। নবজাগরণ ক্লাবের পক্ষ থেকে আয়োজিত কোচিং ক্যাম্প ভবিষ্যতে অনেক প্রতিভাকে গড়ে তুলবে এমনটাই প্রত্যাশা। দুর্গাপুর ফুটবলের ভবিষ্যৎ – এই ম্যাচ কি নতুন পরিবর্তনের বার্তা? দুর্গাপুরের নবজাগরণ ফুটবল কাপ২০২৫ তাই শুধু একটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন নয়, এটি ছিল এক ফিরে পাওয়ার গল্প, এক সমাজের বার্তা। এই শহরের ফুটবল তার সংস্কৃতি, তার আবেগ, আজ নতুন আলোয় উদ্ভাসিত। নতুন প্রজন্ম যদি এই স্রোতে ভেসে ওঠে তবে খুব শিগগিরই দুর্গাপুর আবার ফুটবলের মানচিত্রে নিজেকে উজ্জ্বল করে তুলবে।।
সমরেন্দ্র দাস, Lcw India দুর্গাপুর

