বুধবার সকাল থেকেই দুর্গাপুরের ভিড়িঙ্গী “আনন্দ শিশু উদ্যান” যেন নতুনভাবে সেজে উঠেছিল। শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম প্রয়াত আনন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায়ের ১০০তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল এক বিশেষ স্মরণসভা। শহরের মানুষ, শ্রমিক সংগঠন, প্রশাসন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দিনটি রূপ নিয়েছিল এক বিরল সম্মেলনে।

দিনের শুরুতেই শ্রমিক আন্দোলনের এই কিংবদন্তি নেতার প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করেন রাজ্যের আইন, বিচার ও শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন আনন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায় এর সুযোগ্য পুত্র তথা দুর্গাপুর নগর নিগমের প্রাক্তন মেয়র অপূর্ব মুখোপাধ্যায় ও পুত্রবধূ তথা বর্তমানে দুর্গাপুরনগর নিগমের চেয়ারপার্সেন অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়। এছাড়াও এদিন উপস্থিত ছিলেন আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান কবি দত্ত, প্রবীণ শ্রমিক নেতা প্রভাত চট্টোপাধ্যায়, জেলা কংগ্রেস সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তী, সিপিআই(এম) নেতা বিপ্রেন্দু চক্রবর্তী, দুর্গাপুর মহকুমা শাসক সুমন বিশ্বাস সহ বিশিষ্টজনেরা। রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে আনন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায়ের শতবর্ষ স্মরণ অনুষ্ঠানে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে এই অনুষ্ঠান। এদিন “আনন্দ গোপাল মুখার্জী মেমোরিয়াল সোসাইটি”র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির, রক্তদান শিবির, শ্রবণ সমস্যাজনিত মানুষের জন্য বিশেষ সচেতনতা শিবির এবং মহিলাদের জন্য ক্যান্সার সচেতনতা শিবির।

উল্লেখ্য আনন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায় শুধুই শ্রমিক রাজনীতির একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নন; দুর্গাপুরের শিল্পায়নের ইতিহাসে এক অনন্য স্থপতি। তিনি রাজনীতির প্রারম্ভিক দিন থেকেই শ্রমিকদের নিয়ে তাঁর সংগ্রাম তাঁকে এনে দেয় জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বহুবার নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি, দু’বার লোকসভায় আসানসোল কেন্দ্রের সাংসদও ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে আইএনটিইউসি এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল মেটাল ওয়ার্কার্স ফেডারেশন-এ শ্রমিকদের দাবি আদায়ের সংগ্রাম নতুন দিশা পায়।

দুর্গাপুর টাউনশিপের বিস্তার, দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা গড়ে ওঠা, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আবাসন এবং কল্যাণমূলক পরিকল্পনা, সব কিছুর সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল তাঁর নাম। প্রশাসনের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের সংলাপে তিনি ছিলেন সেতুবন্ধনকারী। এ কারণেই স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি আজও “দুর্গাপুরের রূপকার” হিসেবে পরিচিত।
তার জন্মশতবর্ষে যে সম্মান, যে উৎসাহ, যে জনসমাগম দেখা গেল, তা স্পষ্ট জানিয়ে দিল মানুষ তাঁকে ভুলে যায়নি। তাঁর কর্মদর্শন, উন্নয়নের স্বপ্ন এবং শ্রমিকস্বার্থে লড়াই করা মনোভাব আজও সমাজের পথপ্রদর্শক।
আনন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায়ের ১০০তম জন্মদিন কেবল একজন নেতাকে স্মরণ নয়; এটি শ্রমিক আন্দোলনের এক সোনালি অধ্যায়কে নতুন করে ফিরে দেখার সুযোগ। যার কাছে রাজনীতি মানে ছিল মানুষের পাশে থাকা।
দুর্গাপুরের আকাশে আজও তাঁর কাজ, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর স্বপ্ন প্রতিধ্বনিত হয়। শতবর্ষে তাঁকে এই সম্মান শহরের পক্ষ থেকে এক চিরন্তন কৃতজ্ঞতা।
সমরেন্দ্র দাস, Lcw India দুর্গাপুর

