spot_img
Thursday, October 22, 2026
Durgapur
clear sky
22 ° C
22 °
22 °
70 %
2.3kmh
5 %
Thu
32 °
Fri
32 °
Sat
32 °
Sun
31 °
Mon
29 °
Homeসর্বশেষগুরুর ডাকে ফিরে এলো শিষ্যরা, মাটিতে গাঁথা স্মৃতির উৎসব

গুরুর ডাকে ফিরে এলো শিষ্যরা, মাটিতে গাঁথা স্মৃতির উৎসব

-

“যেখানে ফেলনা কিছুই নয়, সেখানেই জন্ম নেয় শিল্প”

“মাটির ভেতরের লুকিয়ে থাকা শিল্পের পুনরাবিষ্কার”

সময় কখনো থেমে থাকে না। তবুও কিছু কিছু জায়গা, কিছু কিছু সম্পর্ক সময়ের স্রোতকে অস্বীকার করে নিঃশব্দে বেঁচে থাকে। বীরভূমের বিদ্যাধরপুরের খঞ্জনপুর এ তেমনি এক সৃষ্টিশীল আশ্রয় – “স্টুডিও মৃত্তিকা।” ২৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই শিল্প কেন্দ্রের প্রতিটি ইট, প্রতিটি মৃত্তিকা কনা যেন আজও বহন করে শিল্পী গুরু ও শিষ্যের যৌথ স্মৃতি। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত ভাস্কর্য শিল্পী ও অধ্যাপক আশীষ ঘোষের হাতে গড়া স্টুডিও মৃত্তিকার ট্যাগলাইন — “কিছুই নয় আর ফেলনা”-  শুধু একটি বাক্য নয়, এক দার্শনিক অবস্থান। সেই দর্শনকেই কেন্দ্র করে ২০২৬ সালের ২ থেকে ৪ জনুয়ারি এখানে অনুষ্ঠিত হলো তিনদিনের বিশেষ কর্মশালা “রেড সয়েল ডায়লগস”। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর এই কর্মশালার মাধ্যমে এক অনন্য পুনর্মিলনের সাক্ষী থাকলো স্টুডিও মৃত্তিকা ২০০৫ সালে বর্ধমানের ক্যাড(CAD) ডিজাইন আর্ট কলেজের ভাস্কর্য বিভাগের ছাত্ররা — যারা একসময় অধ্যাপক আশীষ ঘোষের কাছে শিল্পের হাতে করে নিয়েছিলেন — আজ সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।

তবুও গুরুর এক ডাকে তারা হাজির হলেন আবার সেই চেনা কর্মশালায়। সুকল্যাণ দত্ত, বামদেব মন্ডল, হরজিৎ সিং, বিশ্বজিৎ মন্ডল, সুমন মন্ডল, অমিত দে, ভানু পান, অভিজিৎ ঘোষ, শংকর চট্টোপাধ্যায় এবং পার্থপ্রতিম পাল — দশজন শিল্পীর এই উপস্থিতি যেন সময়কে মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল। জীবনের দায়িত্ব, সংসারের ভার আর কর্মব্যস্ততার গণ্ডি পেরিয়ে তিন দিনের জন্য তারা ফিরে গিয়েছিলেন কৈশোরে। চীনা মুখে সময়ের ছাপ স্পষ্ট — কোথাও পাকা চুল, কোথাও চোখে অভিজ্ঞতার গভীরতা। তবুও একবার নাম ধরে ডাকতেই ভেঙে পড়ল সব দূরত্ব। গুরু শিষ্যের সম্পর্ক আবার নতুন করে প্রাণ পেল। এই কর্মশালার মূল মাধ্যম ছিল ল্যাটেরাইট (মাকড়া)  পাথর ও লোহা। অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা জানালেন, “আমরা যারা ২০০৫ সালে ক্যাড ব্যাচের ছাত্র আজ এখানে ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা গুলো নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি”। পাথরের নিজস্ব চরিত্র, তার স্বাভাবিক শক্তি ও ভূমির গল্পকে সামনে রেখে ভাস্কর্য নির্মাণই ছিল তাদের লক্ষ্য। রেড সয়েল রেড মেমোরিজ।

অধ্যাপক আশীষ ঘোষ বলেন, “দেখতে দেখতে বিশটা বছর কেটে গেছে। তাই ভাবলাম আমাদের দেশের লাল মোড়াম মাটি – ল্যাটেরাইট মৃত্তিকাকে নিয়ে এমন কিছু কাজ করা দরকার, যা ভবিষ্যতের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকবে। সেই ভাবনা থেকেই প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে এই অভিনব কর্মশালার আয়োজন।”

ল্যাটেরাইট শুধু একটি নির্মাণ উপাদান নয় – এটি বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বীরভূমের ইতিহাস, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের বাহক। এক সময় রাস্তা তৈরীর প্রধান উপাদান থেকে শুরু করে অসংখ্য স্থাপত্য এর ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। কিংবদন্তি শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ এর  শিল্পচেতনাও ছিল এই মাটির খুব কাছের। বিশ সাল বাদ – সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক ভাস্কর্যের ভাষায় নতুন করে তুলে ধরাই ছিল ‘রেড সয়েল ডায়লগস’ এর মূল উদ্দেশ্য। এই তিন দিনে শুধু ভাস্কর্য তৈরি হয়নি- তৈরি হয়েছে সম্পর্কের নতুন সেতু। স্টুডিও মৃত্তিকায় এমন এক আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল, যেখানে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। শিল্প স্মৃতি আর মানবিক আবেগ একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি করেছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে স্টুডিও মৃত্তিকার এই কর্মশালা হয়ে উঠল এক আবেগের দলিল গুরু শিষ্যের এই মিলনমেলা প্রমাণ করে দিল সময় এগিয়ে চলে জীবন বদলায়। কিন্তু কিছু সম্পর্ক থাকে সময়ের ঊর্ধ্বে। শৈশব কখনো ফুরায় না; সে শুধু স্মৃতির ভেতরে অপেক্ষা করে আবার ফিরে আসার জন্য।

সমরেন্দ্র দাস, Lcw India বীরভূম

Related articles

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe

Latest posts